জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণে দেশ পুনর্গঠনে সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশলের কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’—এই তিন ধাপের কৌশলে বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া এই ভাষণে তিনি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপরেখা, বিশ্বশান্তি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈষম্যহীন ব্যবহারের ওপর জোর দেন।
ভাষণের শুরুতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের শাসন-শোষণের পর বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
দেশ পুনর্গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে।’
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারে ফেরানোর আহ্বান
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কারণে দেশের সম্পদ ও পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে জাতিসংঘে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াই এ সংকটের একমাত্র সমাধান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন
ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ করার পরিকল্পনা
দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। নারীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর কথা জানান তিনি।
‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ চায় সরকার
শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতিরও গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন দেশের প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এসব কার্ড সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এআই ব্যবহারে বৈষম্য দূর করার আহ্বান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সুফল যেন সব দেশের মানুষ সমানভাবে পায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমানের ডিজিটাল বৈষম্য যেন ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের বৈষম্যে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে তরুণরা নিরাপদে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং প্রতিটি শিশু নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এসএস




Comments